যে  সময়ে একই এসে একটি মহিলা স্বাধীনতা সংগ্রামে তার বীরঙ্গনা কে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাঁর নাম সুচিতা কৃপালিনী । তিনি ছিলেন প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী উত্তরপ্রদেশের। যেটি ভারতের সবথেকে বড় রাজ্য। স্বাধীনতা আন্দোলনের তার ভূমিকা অপরিসীম মহাত্মা গান্ধীর সাথে সাথে পা মিলিয়েছেন তিনি। জে বি কৃপালিনীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। যাকে আচারিয়া কৃপালিনী বলা হত। স্বাধীনতার পরেও তিনি অনেক কিছু করেন। ১৯৬৩ সালে ভারতের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে উত্তরপ্রদেশে গদিতে বসেন। 


তিনি মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন পরে কিন্তু  স্বাধীনতা আন্দোলনে তার ভূমিকা কতটুকু সেটাই আজ আলোচনা করব। ২৫ জুন ১৯০৮ সালে তিনি আমবালা পাঞ্জাবে তিনি জন্মগ্রহণ করেন । তাছাড়া তিনি কবি বিচক্ষণ একজন নেত্রী ছিলেন, যিনি তার নিজের বায়োগ্রাফি লিখে যান। কিন্তু দুঃখের বিষয় তিনি তার বায়োগ্রাফি সম্পূর্ণ করে যেতে পারেননি। যখর নামই ছিল 'unfinished biography' । এই বায়োগ্রাফি কি ছিল পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করব আজ। ইনি ছিলেন একাধারে প্রফেসর অপরদিকে একজন দেশপ্রেমী ও বটে। যখন জহরলাল নেহেরু ফেমাস বক্তৃতা 'Tryst with destiny' দিচ্ছিলেন তখন তিনি জোরে ভারতের ন্যাশনাল অ্যান্থম জনগণমন অধি , বন্দেমাতরম অ্যাসেম্বলিতে গেয়ে ওঠেন। সময়টা খুবই আবেগপ্রবণ এবং গর্বের ছিল। 


ইনি ছিলেন একজন বাঙালি উনার নাম ছিল সুচেতা মজুমদার(Sucheta Majumdar) । আচারিয়া কৃপালনির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তার নামের এই পরিবর্তন ‌। এনার পিতা ছিলেন একজন ডাক্তার যিনি তার দেশকে খুবই ভালবাসতে আর তারই মেয়ে হয় সেই রক্তের দাম মিটিয়েছেন তিনি। সুচেতা মজুমদার এনার পঠন-পাঠন কালে প্রচুর স্কুল এবং কলেজ বদল করেছিলেন। এখানে একটা গল্প আছে, যখন তিনি লাহোরের কিরাট স্কুলে যখন ইনি পড়তেন। এক বাইবেলের টিচার হিন্দু ধর্মের নামে উল্টোপাল্টা বলে দেয়। যথারীতি সুচেতা বাড়ি ফেরে এবং তার পিতা কে সব কথা বলে এবং তার পিতা হিন্দু ধর্মের সব রিচুয়াল তাকে বোঝায় আর তাকে গীতা পড়তে উৎসাহিত করে। পরের দিন সুচেতা এবং তার বোন সুলেখা স্কুলে যায় এবং সেই টিচারকে ভগবদ্গীতার কিছু শ্লোক কোট করে দেখায় তার টিচারকে। আর তারপর থেকে সেই টিচের এই বিষয়ে কখনো তিনি তার আলোচনা করেননি। 

Sucheta Kripalani singing Vande Mataram on the eve of indian independence. Image credit: The Quint

তাছাড়া অনেক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বাচ্চারা পড়তো তার সাথে যাদের সাথে মজা মশকরা করত এই দুই বোন। তিনি ফাইনাল ডিগ্রী নিয়েছিলেন ইন্দ্রপ্রস্থা কলেজ এবং পরবর্তীতে সেন্ট স্টিফেন্স কলেজে যান আর তারপর বানারাস হিন্দু ইউনিভার্সিটি তে পড়ানো শুরু করেন। দু জায়গা থেকে আফার পান তিনি, এক লাহোর ইউনিভার্সিটি  যেখানে ভালো সেলারিও দিচ্ছিলেন তারা তবে তিনি শেষমেষ বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি (Banaras Hindu University) তে যোগদান করেন যেখানে পয়সা কম ছিল। তবে তিনি বি.এইজ.ইউ  কেন নিলেন ? কেননা বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি তে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্য স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজ রোপণের পিট স্তল ছিল এটি। যখন সুচেতা পড়াতো ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার বলিদান এর ইতিহাস বলতেন। ছাত্র-ছাত্রীদের বলতেন জালিয়ানওয়ালাবাগের কথা স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা। 
 
১৯৩৪ তিনি আচারিয়া কৃপালিনী সংস্পর্শে আসেন। যার আগে মহাত্মা গান্ধীর দ্বারা তিনি প্রভাবিত হন। আচারির কৃপালিনী ছিলেন সুচেতার থেকে ২০ বছরের বড়। ১৯৩৬ এ তারা আরও ঘনিষ্ঠ হন। স্বাধীনতা সংগ্রামী তারা এককভাবে কাজ করেন। আচারিয়া কৃপালিনী ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর ডান হাতের সমান। তিনি ছিলেন বড় মাপের একজন সমাজতান্ত্রিক নেতা। শুধু তাই নয় ইনাদের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি তাদের পরিবার এমনকি গান্ধী নিজেও মেনে নিতে পারেননি। যখন গান্ধীজী সুচেতা কে জিজ্ঞাসা করেন তিনি এ কাজ কেন করলেন? তখন সুচেতার জবাব ছিল, যদি আমি বিবাহ না করি তাহলে এটি একটি বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। আর আপনার তো দুজন কার্যকারী পেয়ে যাবেন তো আপনার চিন্তার কোন কারণ নেই। এখানে বলে দরকার , গান্ধীজী যতগুলো মুভমেন্ট করেন সবগুলোতে আচারিয়া কৃপালিনী যোগ দিয়েছিলেন।

  ১৯২৯  সাল সবে সবে  গ্রাজুয়েট হয় সুচেতা বয়স তখন মাত্র ২১ বছর। আর সেই সময় তাকে ছেড়ে চলে যায় তার বাবা এবং তার একমাত্র বোন। আর আচারিয়া কৃপালিনীর (J.B. Kripalani) সাথে বারানসী হিন্দু ইউনিভার্সিটি তে যোগাযোগ হয় তার। আচরিয়া কৃপালিনী সক্রিয় স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত শক্তিকে প্রবল করতে ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে ১৯৩৮ সালে সুচেতা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর সক্রিয় রাজনীতিতে চলে আসেন। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের শুরু ১৯৪২ তে। ১৯৪০ তে সুচেতা কৃপালিনী মহিলা কংগ্রেস তৈরি করেন। ১৯৪২ এ ভারতছাড়ো আন্দোলনের সূত্রপাত হয় এবং গান্ধীজি বলেন আমরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কে কোন রকমের সমর্থন করিনা। আর সেজন্য সব নেতাদের ধরে ধরে জেলবন্দি করা হয়। কিছু কিছু কংগ্রেস বিরোধী নেতা ছাড়া সব নেতাদেরই জেলবন্দি করে ইংরেজরা। আর সেখানেই পড়ে সুচেতা কৃপালিনী এক বছর জেল খাটতে হয়। যদিও খুব বেশি পরিমাণে ঘৃণা করতেন ইংরেজদের। জালিয়ান ওয়ালাবাগের হত্যাকান্ডের পর সুচেতা কৃপালিনী ইংরেজদের কোন রকম ভাবেই মেনে নিতে পারেননি।

১৯৪৬ গণপরিষদ্ গঠন হয় , এখানে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের মধ্যে বিরাট পরিমাণে মতবিরোধ ছিল। মুসলিম লীগের কথায় তাদের স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্রের দাবিতে অনড় ছিলেন জিন্না। তবে এখানে যেহেতু নির্বাচনে কংগ্রেস যেতে সেহেতু কংগ্রেস কখনো যায়নি জিন্না সেটা নির্ধারণ করুক। যে গনপরিষদ গঠন করা হয়েছিল, তার অধিবেশন বসে ২৯৯ জন সদস্য নিয়ে যার মধ্য ১৫ জন মহিলা সদস্য ছিলেন। আর এর মধ্যে একজন ছিলেন সুচেতা কৃপালিনী। 

kriplani with (from left to right) Ulla Lindstrom, Barbara Castle, Cairine Wilson and Eleanor Roosevelt in 1949. Image Credit: Wikipedia
 
১৯৪৭ ভারত স্বাধীনতা পায় আর জহরলাল নেহেরু জাতির উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দেন। সুচেতা কৃপালিনী বন্দেমাতারাম, জন গণ মন অধি গর্বের সাথে গিয়ে ওঠেন। ১৯৪৯ ইউনাইটেড ন্যাশনে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি। ১৯৪৭ এ জহরলাল নেহেরু ক্যাবিনেট মন্ত্রিসভা গঠন করেন। জহরলাল নেহেরু গণতান্ত্রিক কাঠামোকে সম্মান জানিয়ে প্রত্যেক দলকে আহবান করেন সে হোক তার বিরোধী দল এবং তার ক্যাবিনেটে স্থান দেন। কিন্তু সবাই বুঝতে পারছি না এটি কখনোই চলবে না, স্বাধীনতার আগে ব্যাপারটা ছিল অন্য কিন্তু স্বাধীনতার পরে সবাই তার নিজের ক্ষমতা দেখাতে ব্যস্ত ছিল। ১৯৪৭ এর পর নেহেরুর খুব ঘনিষ্ঠ নেতারা কংগ্রেস ছেড়ে চলে যেতে শুরু করেন। আর সেই সব মন্ত্রীদের মধ্যে একজন ছিলেন  জে.বি কৃপালিনী । জে.বি কৃপালিনী ছিলেন একজন সমাজতান্ত্রিক নেতা। আর জহরলাল নেহেরু ছিলেন একজন পুঁজিবাদী। আর নেহরুর বিরুদ্ধে অনেকের অভিযোগ ছিল যে তিনি যেটা বলে দেবেন সেটাই ঠিক কখনো কারো কথা শুনতেন না। আর সেখানে বহু সমাজতান্ত্রিক নেতা নেহেরুল থেকে দূরে সরে যান। 

সমাজতান্ত্রিক নেতারা তারা নতুন দলের প্রতিষ্ঠা করেন। তার নাম দেন কিশান মজদুর প্রজা পার্টি (KMPP) ১৯৫০ এ প্রতিষ্ঠা পায় । ১৯৫২ এই পার্টি থেকে সুচেতা কৃপালিনী দিল্লি বিধানসভা থেকে নির্বাচনে প্রার্থী হন। কিন্তু ১৯৫৭ সুচেতা আবার কংগ্রেসে চলে যায়। ১৯৫২, ১৯৫৭ এবং ১৯৬৭ এই তিন বার তিনি লোকসভার মেম্বার ছিলেন। 

 
১৯৬৩ কামরাজ তার পরিকল্পনা নিয়ে আসে, যেটি হলো যত রকমের বড় বড় কংগ্রেস নেতা  আছেন তাঁরা  নিজ পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে কাজ করতে হবে দেশের জন্য না দলের জন্য । তবে এটা বলা হয় নেহেরু তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধীর পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার 
পথকে সোজা করছিলেন এই পরিকল্পনার মধ্যে দিয়ে । তবে সেটা আলোচনা সাপেক্ষ। এখানে কামরাজ নিজেই ইস্তফা দিয়ে দিয়েছিলেন। ওই সময়ে উত্তর প্রদেশের যে মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন সি. বি গুপ্তা উনিও ইস্তেফা দিয়ে দেন ।  এখানে বলা দরকার কংগ্রেসের দুটি গ্রুপ ছিল একটি হল সি.বি গুপ্তা অপরটি হল কমলাপতি ত্রিপাঠী। সি. বি গুপ্তার পর কমলাপতি ত্রিপাঠীর মুখ্যমন্ত্রী হবার কথা ছিল কিন্তু সি. বি গুপ্তা কখোনই চাননি কমলাপতি ত্রিপাঠী মুখ্যমন্ত্রী হোক। আর সেখানেই তিনি সুচেতা কৃপালিনীর নাম সুপারিশ করেন। সুচেতা কৃপালিনী নাম যখন নিশ্চিত হয়ে যায়। তখন অনেকের বক্তব্য একজন মহিলা কি করে মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন। অনেক প্রশাসনিক কর্তারা বলেন আমরা কোন মহিলার নেতৃত্বাধীন কাজ করবো না। তখন মহিলা পক্ষে এত বড় পোস্টে যাওয়া পুরুষের কাছে একটা অনীহা ছিল। আর সব কথার অবসান ঘটিয়ে  ১৯৬৩ তে  প্রথম স্বাধীন ভারতের মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হন সুচেতা কৃপালিনী। তোর কার্যকাল ১৯৬৩-১৯৬৭ পর্যন্ত তারপরে আবার সি. বি গুপ্তা আসে।  ১৯৬৭ লোকসভা নির্বাচনে গোন্ডা নির্বাচনী এলাকা থেকে সংসদ হন। অবশেষে ১৯৭১ এ রাজনীতিকে বিদায় নেবে মহিষী নারী‌‌ এবং ১৯৭৪ এ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
 
 

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন