দ্যা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত খবরে কিম জং উন তার দেশের এই সংকটের কথা জানিয়েছেন। যে নর্থ কোরিয়া বর্তমান সময়ে একটি বড় খাদ্য সংকটে ভুগছে। কারণ তিনি এখানে বলেন বন্যার জন্য এবং করোনার জন্য এই অবস্থা হয়েছে। কিম জং উন এমন নেতা তিনি কখন'ই এই স্টেটমেন্টে সম্মতি দিতেন না কি উনার দেশে এমন অবস্থা হতে পারে বা হয়েছে। উত্তর কোরিয়া, চীন এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাশিয়ার মতো দেশ নিজের মুখে স্বীকার করেনা তাদের খারাপ অবস্থার কথা। এই দেশগুলির সরকার তাদের ক্ষমতাকে খুবই উপভোগ করে। সরকার সব সময়ই তাদের জনগণকে বলে দেশ ভালো আছে, বিশ্বের মধ্যে কোন রকম সমস্যা নেই।
এখন একটাই প্রশ্ন নর্থ কোরিয়া খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে তবে সেটা কতটা ভয়ঙ্কর। না সেটা প্রাথমিক পর্যায় মাত্র? এখনো তো মানুষের মৃত্যু শুরু হয়নি তবে বাজার মূল্য এখানে আকাশ ছুঁই ছুঁই। একটি সাধারণ কফির প্যাকেট এখানে ইন্ডিয়ার টাকায় প্রায় ₹7200 থেকে ₹7300 মতো। যদি উত্তর কোরিয়ায় আপনাকে বর্তমান সময়ে একটি কলা কিনতে হয় তাহলে আপনাকে দিতে হতে পারে যার মূল্য ₹3000 - ₹4000 টাকা। তবে ইন্ডিয়ান কারেন্সি সাথে বিস্তর পার্থক্য না থাকলেও এই পার্থক্যটা যে কোন না সেটাও জানা দরকার। কোরিয়ায় জে কারেন্সি ব্যবহার হয় তার নাম ওয়ান ( North Korean Won )। আজকের সময় দাড়িয়ে ইন্ডিয়ার 1 টাকার সমান উত্তর করিয়ার 12.14 won।
আর এই মত অবস্থায় সম্পূর্ণ চাপ আসচ্ছে উত্তর কোরিয়ার কৃষকদের উপর। সরকার থেকে বলা হচ্ছে যেমন করেই হোক আরো বেশি পরিবারে ফসল উৎপাদন করতে। তবে কৃষকদের বক্তব্য ফসল বেশি ফলানোর জন্য সারের প্রয়োজন যে সারও কৃষকদের কাছে নেই । এখন উত্তর কোরিয়ার সরকারের বক্তব্য প্রত্যেক কৃষক পরিবার থেকে 2 লিটার মূত্র দিতে হবে সরকারকে । আর সেই মূত্র থেকেই উত্তর কোরিয়ার ফ্যাক্টরিতে বানানো হবে সার । রেডিও ফ্রি এসিয়ার একটি আর্টিকেলে এই খবর প্রকাশিত হয়। তবে নর্থ করিয়ায় হঠাৎ করে কেন এমন খারাপ অবস্থা হয়ে গেল ?
এটাতো ঠিক কোভিড পরিস্থিতির কারণে বহু দেশে এর প্রভাব পড়েছে তবে উত্তর কোরিয়ার এতটা খারাপ অবস্থা কেন? তাহলে বলতে হয় উত্তর কোরিয়ার আগের অবস্থা কেমন ছিল আর কেনই বা হল এই পরিনতি? উত্তর কোরিয়ার জনসংখ্যা 2 কোটি 60 লক্ষের আশেপাশে। 2006 এ একটা সমীক্ষা করা হয় নর্থ কোরিয়ার কৃষি কাজ নিয়ে । উত্তর কোরিয়া জনসংখ্যার নিরিখে প্রতিবছর 5.3 মিলিয়ন শস্য লাগে । যেটা পুরোটাই উৎপাদন হয় এই দেশের মধ্য। তবে সমস্যা হলো এই যে উত্তর কোরিয়ার যে কৃষিজমি তা এত উর্বর নয়। সেজন্য নর্থ কোরিয়ার উৎপাদিত ধান, গম, ভুট্টা এসব মিলে উৎপাদনের পরিমাণ বছরে 4.5 মিলিয়ন। 0.8 মিলিয়নের যে শূন্যস্থান সেটি প্রথম থেকেই বজায় ছিল। তাছাড়া উত্তর কোরিয়া চীন, রাশিয়া এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে তাদের খাদ্য শস্য আমদানি করতো ।
কিন্তু এ বছর দু দিক দিয়ে তাদের এই সংকট দেখা দেয়। 4.5 মিলিয়ন খাদ্যশস্য উৎপাদন করত তারা। তাতেও দেখা দেয় ঘাটতি। কিছুদিন আগে নর্থ কোরিয়া হয়ে যায় এক বিপর্যস্ত বন্যা যার কারণে এই খাদ্যশস্যের উৎপাদনের পরিমাণে বিরাট ঘাটতি দেখা দেয়। প্রচুর খাদ্য শস্য নষ্ট হয় বন্যাতে। তাছাড়া কিছু টাইফুন হয়। যার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফসল। উপর থেকে কভিড এর এই মহামারীর কারণে উত্তর কোরিয়া বন্ধ করে দেয় তাদের বর্ডার। নর্থ কোরিয়া তিন দেশের সাথে তাদের বর্ডার যুক্ত আছে। নর্থ কোরিয়ার পাশেই আছে সাউথ কোরিয়া, তাছাড়া চায়নার সাথে এবং অল্প কিছুটা রাশিয়ার সাথে আছে। উত্তর কোরিয়া বরাবর দাবি করে কভিডে আক্রান্ত হয়নি তার দেশ। এটা একটা বড় সমস্যা হয়েছে তাদের বর্ডার সম্পূর্ণ সিল করে দেওয়া হয়েছে। চায়না থেকে আমদানি করতে পারছিনা কোন খাদ্য শস্য বা ব্যবহারকারী কোন সামগ্রী। কেননা তাদের একটাই ভয় যদি চায়না থেকে কোভিড তাদের দেশে এসে পড়ে তাহলে তদের সামর্থ্য নেই কোভিডের সাথে লড়বার।
সবশেষে এখানে সামনে আসে যে উত্তর কোরিয়ায় প্রতিবছর 1 মিলিয়ন টন খাদ্যশস্যের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। যেটি খুব বড় মাপের একটি সংখ্যা। যাদের দরকার প্রতিবছর 5 মিলিয়ন টনের পাশাপাশি খাদ্য। সেখানে যদি 1 মিলিয়ন টনের ঘাটতি দেখা দেয় তবে দেশের প্রায় 20 শতাংশ মানুষের না খেয়ে থাকতে হবে। আর সেই জন্য এমন অনেক আর্টিকেল দেখতে পাবেন যেখানে বলা হচ্ছে উত্তর কোরিয়ায় মিলিয়নের বেশি সাধারণ মানুষের মৃত্যু হতে পারে।
আরও পড়ুন:ইনি ছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম বাঙালি মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাধীন ভারতের প্রথম সফল নারীবাদী মহিলা !
আজকের জায়গায় গায়ে দাঁড়িয়ে 10 থেকে 20 লাখ মানুষের মৃত্যু জাতীয় মানব অধিকার সংরক্ষন কমিটির একটি লজ্জার বিষয় হিসেবে দাঁড়াবে। এখানে যে w.h.o. এর ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্র্যাম চালাচ্ছে তার আওতায় কেন আনা হচ্ছে না উত্তর কোরিয়াকে। নানারকম আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা মুখে উত্তর কোরিয়া। আমেরিকা সহ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, UNO security counselling তার উপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে রেখেছে । তবে কেন? নিষেধাজ্ঞার জালি উত্তর কোরিয়া এতটাই জড়িত যে এইসব সংস্থার পক্ষে কাজ করা অসম্ভব হয়ে গিয়েছে। কারণ খাদ্যশস্য বা পণ্য আসার ক্ষেত্রে অনেক রকম ফর্মালিটি করতে হয় যেটা করা সম্ভব হচ্ছে না। তারমানে উত্তর কোরিয়ার কাছে আন্তর্জাতিক সাহায্য পাওয়ার চেয়ে পথ সেটাও বন্ধ। তবে এসবের উর্ধ্বে গিয়ে উত্তর কোরিয়া যদি চায়নার কাছ থেকে খাদ্যশস্য আমদানী করে তবুও বলে দি চায়নায় ও যথাযথ খাদ্য শস্যের ঘাটতি আছে। কোন দেশ চাইবে না তার দেশের মানুষ নাকি অন্য মানুষকে সাহায্য করতে। যদি চায়না থেকে খাদ্যশস্য আমদানি করা হয় তা হলেও দ্রব্যমূল্যের দাম এতটাই বেড়ে গিয়েছে কোরিয়াতে যে তার মূল্য চোকাতে তাদের হিমশিম খেতে হবে।
তবে এইসবের শেষমেষ সমাধান কি হতে পারে? যেসব উত্তর কোরিয়া সাধারণ মানুষ আছে যাদের জিওপলিটিক্স নিয়ে কোনোরকম মাথা ব্যাথা নেই যাদের দুবেলা খেতে পেলেই তাদের জীবন অতিবাহিত হয়। ও কোন রকম কিছু না করেই উত্তর কোরিয়ার তানাশাহি কিং জং উন এর একগুঁয়েমি স্বভাবের ছত্রছায়ায় তাদেরকে না খেয়ে মরতে হবে। কিম জং উনের বরাবরই চ্যালেঞ্জ তাদের খাওয়া হোক বা না হোক তাদেরকে নিউক্লিয়ার বোম বানাতে হবে সেখানে আমেরিকার লক্ষ্য উত্তর কোরিয়াকে কিভাবে নিউক্লিয়ার বোম বানানো থেকে বিরত রাখা যায়। আর এই ইগোর কারণে কিম জং উনের দেশ অনাহারে ভুগছে। এখানে জো বাইডেন কে একটু নরম হলে হয়তো উত্তর কোরিয়া এবং আমেরিকার মধ্যে একটি ভালো সম্পর্ক স্থাপন হতে পারে। আমেরিকা যদি এই অসময়ে উত্তর কোরিয়ার পাশে এসে দাঁড়ায় বিনামূল্যে তাদেরকে খাদ্যশস্য প্রদান করে অথবা সার দিয়ে খাদ্যশস্য উৎপাদনে তাদেরকে সাহায্য করে হয়তো কিম জং উনের মন গলতেও পারে। আপনার মতামত কি কমেন্ট বক্সে জানাতে ভুলবেন।
সূত্র- দ্যা ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন