ধনঞ্জয় (Dhananjoy Chatterjee)কে মনে আছে ? না না কেউকেটা নয় তবে নব্বইয়ের দশকে ছিলো সংবাদের শিরোনামে। ধরা পড়ার পর থেকেই সে আলিপুর জেলের জেলারকে বলে আসতো, ‘আপনি বড় অফিসার৷ দেখবেন অভিযোগের তদন্ত যেন ঠিকঠাক হয়৷’ অল্প শিক্ষিত এক সিকিউরিটি গার্ডের কথায় সেদিন কেউ কান দেয়নি। চোদ্দ বছর জেল খাটার পর ২০০৪ সালে স্বাধীনতা দিবসের ঠিক আগের দিন ভোরবেলায় ফাঁসি হয়ে যায় তার। কি অদ্ভুত বিচার!

 

কেটে গেছে তারপর দশ দশটি বছর। ২০১৪ সালের ২৯শে জুন, আচার্য প্রশান্ত মহলানবীশের জন্মদিন উপলক্ষে দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে পরিসংখ্যান দিবস। আর ঠিক সেই দিনেই মামলার কাগজপত্র খুঁটিয়ে দেখে, সাক্ষীদের বয়ান এবং কলকাতা পুলিশের (Kolkata Police) তরফে বিচার-পর্বে পেশ করা মেটিরিয়াল এভিডেন্স বিশ্লেষণ করে ISI এর দুই রাশিবিজ্ঞানী অধ্যাপক দেবাশিস সেনগুপ্ত ও প্রবাল চৌধুরী ঘোষণা করলেন, ধনঞ্জয়কে দোষী সাব্যস্ত করার মতো সংশয়াতীত কোনও প্রমাণই হাজির করা হয়নি আদালতে৷ তাঁদের গবেষণায় উঠে এসেছে হেতাল পারেখ (Hetal Parekh) হত্যার পিছনে ‘অনার কিলিং’-এর স্পষ্ট ইঙ্গিত।
To err is human ! কিন্তু সে ভুল যদি সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতি করে ফেলেন..... ? 
 

 
দুই রাশিবিজ্ঞানীর মতে পারিবারিক কোন কেচ্ছা চাপা দিতেই খুন হয়েছিল হেতাল এবং বলির পাঁঠা করা হয়েছিল দরিদ্র অসহায় এক সিকিউরিটি গার্ডকে । ধনী পারেখ পরিবারের দাবীকে সিলমোহর লাগিয়ে দিলেন পুলিশ ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা । বিচার বিভ্রাটে ঘটে যায় আরেকটা হত্যাকান্ড ... Judicial killing ! ১৯৯০-এর ৫ই মার্চ পদ্মপুকুর এলাকার এক অ্যাপার্টমেন্টের তিন তলার ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয়েছিল ২১টি গুরুতর আঘাতের চিহ্ন-সহ হেতাল পারেখ নামে এক গুজরাতী কিশোরীর রক্তাক্ত লাশ৷ দু’মাস পর, ১২ই মে বাঁকুড়ার কুলুডিহি (Kuludihi) গ্রামের বাড়ি থেকে অভিযুক্ত ধনঞ্জয়কে গ্রেপ্তার করা হয়৷ ফাঁসির দাবিতে পথে নামেন বুদ্ধিজীবী মহল, সোচ্চার হন খোদ মুখ্যমন্ত্রী জায়া মীরা ভট্টাচার্য(Mrs. Meera Bhattacharjee)। চোদ্দো বছর পর ধনঞ্জয়ের ফাঁসির দিন ঘোষণা হতেই বিতর্ক পৌঁছয় অন্য মাত্রায়৷
সুপ্রিম কোর্ট এবং রাষ্ট্রপতি-রাজ্যপালের কাছে ক্ষমাভিক্ষার শেষ চেষ্টায় ফাঁসির দিন এক দফা পিছিয়েও যায়৷ শেষ পর্যন্ত অবশ্য নিম্ন আদালতের মৃত্যুদণ্ডের আদেশই বহাল থাকে৷ ২০০৪-এর ১৪ই আগস্ট কাকভোরে আলিপুর জেলে ফাঁসি হয়ে যায় বছর চল্লিশের ধনঞ্জয়ের৷ সেটাই এ রাজ্যে শেষ ফাঁসি। বিচার-পর্বে আগাগোড়া নিজেকে নির্দোষ দাবি করা প্রত্যন্ত গ্রামের স্বল্পশিক্ষিত যুবক, পেশায় নিরাপত্তাকর্মী (security guard) ধনঞ্জয়ের শেষ-বার্তা ফৌজদারি বিচার-ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রেখে গিয়েছিল৷ হেতাল হত্যায় আদালতের রায় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইএসআই-এর গবেষকরাও৷ তাঁদের চোখে ধনঞ্জয় দোষী নন, তাঁদের ইঙ্গিত বরং অনার কিলিংয়ের দিকে৷ 
 
পুলিশের দাবি ছিল, অ্যাপার্টমেন্টের লিফটম্যান খুনের আগে ধনঞ্জয়কে তিন তলায় পৌঁছে দিয়েছিলেন৷ আদালতে কিন্তু সেই লিফটম্যানই জানান, তেমন কিছুই তিনি করেননি৷ জানেন না৷ এমন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে হোস্টাইল ঘোষণা করতে বাধ্য হয় সরকারপক্ষ৷ তিনি ডাকায় তিন তলার ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে ঝুঁকে ধনঞ্জয় জবাব দিয়েছিলেন, অন্য এক নিরাপত্তারক্ষীর এমন দাবিও হালে পানি পায় না ওই বাড়ির বিল্ডিং প্ল্যানের দিকে নজর ফেরালেই৷ কারণ বারন্দাটাই যে আগাগোড়া গ্রিল দিয়ে ঘেরা! রক্তে ভেসে যাচ্ছিল হেতালের দেহ, অথচ কোনও সাক্ষীই ধনঞ্জয়ের পোশাকে দাগ দেখেছেন, এমন দাবি করতে পারেননি৷ পারেখ পরিবারের দাবি মতো খোওয়া যাওয়া হাতঘড়ির বিলের সঙ্গে ধনঞ্জয়ের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া ঘড়ির নম্বর মিলিয়ে পর্যন্ত দেখা হয়নি৷ অকুস্থলে উদ্ধার হওয়া গলার হার ধনঞ্জয়ের বলে দাবি করা হলেও অ্যাপার্টমেন্টেরই এক পরিচারক দাবি করেন, সেটি তাঁর৷ সর্বোপরি হেতালের গোপনাঙ্গে শুক্রাণুর নমুনা মিললেও তা ধনঞ্জয়েরই কি না, ডিএনএ পরীক্ষায় মিলিয়ে দেখা হয়নি৷
ধনঞ্জয়ের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া প্যান্ট-শার্ট, হাতঘড়ির সিজার লিস্টে নিরপেক্ষ কোনও সাক্ষীর সই ছিল না৷ থানায় চা-সরবরাহকারী আর এক দোকানদার ছাড়া আর কাউকেই নাকি পায়নি পুলিশ! সেই দোকানদার আবার আদালতে সাক্ষ্য দিতেও আসেননি৷ হেতালকে ধনঞ্জয় উত্ত্যক্ত করতেন, পারেখ পরিবারের এই দাবির সমর্থনে কোন তথ্য মেলেনি।
 
 
পুলিশের দাবি, ৫ই মার্চ বিকেল ৫টা ২০ থেকে ৫টা ৫০-এর মধ্যে হেতালের মায়ের অনুপস্থিতিতে ধর্ষণ-খুন-চুরির ঘটনা ঘটে৷ আধ ঘণ্টায় ঘটনার এ হেন ঘনঘটা, ২১টি এলোপাথাড়ি আঘাত অসম্ভব বলেই দাবি আইএসআইয়ের গবেষকেদের৷ রক্তে ভেসেছে দেহ, অথচ কোন অস্ত্রই উদ্ধার হয়নি! আর ঘটনার পাক্কা তিনঘন্টা পর কেন পুলিশ কে খবর দেয়া হলো তার কোন সদুত্তর দেয়নি গুজরাটি ঐ ব্যাবসায়ী পরিবার। এতো খামতি, তবু কী ভাবে মঞ্জুর হয়ে গেল মৃত্যুদণ্ড ?
 
 
 
রাশিবিজ্ঞানী দেবাশিসবাবুর বক্তব্য, ঘটনার দিন থেকেই পুলিশের বড়কর্তারা প্রভাবশালী পারেখ পরিবারের বক্তব্যে সিলমোহর দেওয়া শুরু করেন৷ ধনঞ্জয়কে শূলে চড়ানোই একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে৷ পূর্ব-নির্দিষ্ট ছক মেলানোর তাগিদই হয়ে ওঠে তদন্তের চালিকাশক্তি৷ অর্থ ও লোকবলে হীন ধনঞ্জয়ের পরিবার নিম্ন আদালতে তেমন শক্তপোক্ত আইনজীবী নিয়োগও করতে পারেননি৷ যে-সব স্বাভাবিক প্রশ্ন পাল্টা জেরায় তোলার কথা, তেমন কিছুই করা হয়নি৷ অসম লড়াইয়ে হার মানতে হয় অভিযুক্তকে৷ আপিলও এগিয়েছে নিম্ন আদালতের ছন্দেই৷ ফল যা হওয়ার তাই!
 
 
কিন্তু খুন নিয়ে তো প্রশ্ন নেই? প্রবালবাবুদের জবাব, হেতালের পরিবার বিশেষত তার মায়ের আচরণ, অন্য সদস্যদের বক্তব্যের অসঙ্গতি, বাগরি মার্কেটে অলঙ্কার-ব্যবসা তুলে ছ’মাসের মধ্যে শহর ছেড়ে যাওয়া-ইঙ্গিত করছে অনার কিলিংয়েরই৷
বিচার-বিভ্রাটে যে ঘটনার পরিণতিতে ঘটে যায় আর একটি হত্যাকাণ্ড....জুডিসিয়াল কিলিং৷ প্রশ্নের মুখে আজও কলকাতা হাইকোর্টের শেষ মৃত্যুদণ্ড।
* অধ্যাপক প্রবাল চৌধুরী ও দেবাশিস সেনগুপ্তর
"আদালত-মিডিয়া-সমাজ এবং ধনঞ্জয়ের ফাঁসি’ গ্রন্থের ভিত্তিতে লেখা
 

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন