একটি সাহসী মহিলা যার বাজখাই গলার আওয়াজের ভিত নড়ে গেছিলো ৩৫ বছর রাজত্ব করা বামপন্থীর। এই সেই জেদের হুমকার ছিল, যাকে পশ্চিমবঙ্গের বাঘিনী বলা হয়ে থাকে । তিনি আর কেউ নন‌ ২০২১ এও বিপুল ভোটে জয় লাভ করে জয়ী হওয়া বাংলার মা-মাটি-মানুষের সরকার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে সরকার তৃনমূল সরকার। 

আর আজ এই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথটা কিন্তু মসৃণ ছিল না। তাকে চার দশক এইভাবে নিষ্ঠার সাথে মানুষের পাশে থেকেই এই জায়গাটা করে নিয়েছেন । আর এই চার দশকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এমনকিছু প্রতিকূলতা নেই যার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাকে। বিধানসভা থেকে খোলা রাস্তায় নেমে লড়াই করেছেন তিনি। মার খেয়েছেন পুলিশের হাতে এমনকি বিপক্ষ দলের কর্মীদের হাতে। এমনকি ধস্তাধস্তির অপমানের চরম ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়েছেন বারংবার ‌‌। কিন্তু কখনো হার মানেননি তিনি।


মা-মাটি-মানুষের স্লোগান সার্থক রূপ পায় ২০১১ তে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে বামপন্থীদের সোনার কেল্লা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। এবার মমতা তার কন্ঠ রাজ্য থেকে কেন্দ্রে শোনা যায়। ২০১৪ এর লোকসভা তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রে প্রথম মুখ হয়ে ওঠার চেষ্টা করে। এখানে মমতার একটি ভাবমূর্তি ছিল যেখানে দেখতেন বামপন্থীদের বন্ধুত্ব কমিটির সাথে সেখানে  থেকে কোথাও তার মনে হয়েছে এই তরে থাকলে কখনোই তিনি বামপন্থীদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করতে পারবেন না। আর সেই জন্যেই কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে এসে নতুন দল গঠন করেন তিনি। আর তিনি একটি কথা না ভেবেই কংগ্রেসের হাত ছেড়ে দিতে কোন দ্বিধাবোধ করেননি।



১৯৯১ এ কেন্দ্রের নেতা হবার পরই  তিনি প্রথম ব্রিগেডে মিটিং করেন এবং সেখানে উল্লেখ করে আজ থেকে বামপন্থীদের "মৃত্যু ঘন্টা" বেজে গেল। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নরসীমা রাও ‌। তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন তার এই কথায়। শুধু তাই নয় মমতার সাথে কংগ্রেসের সম্পর্ক অনেকটাই খারাপের দিকে চলে যায়। আর যার পরিণাম হয় ১৯৯৭ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস ছেড়ে দেন এবং কখন করেন অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস। শুধু তাই নয় যেতে যেতে কংগ্রেসকে বামপন্থীদের খেলার পুতুল বলে দল ছেড়ে দেন। বামপন্থীদের সর্বনাশ ডাকতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি কংগ্রেস ছাড়েন তাহলে তার সমর্থনে কর্মকর্তাদের দরকার ছিল।


আর তখনই মমতার কাঁধে হাত রাখে এনডিএ।  কংগ্রেসের শত্রু NDA এর মিত্র এই ভেবে মমতাকে তো NDA  টেনে নেয়, তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি নিয়ে নতুন করে মাথাব্যথা তৈরি হয় তাদের মধ্যে। কংগ্রেস ছেড়ে NDA যোগ দিলেও কথায় কথায় ইস্তফা পত্র দেওয়া আবার কোন কথা ছাড়াই ইস্তফা পত্র ফিরিয়ে নিতে। আর শেষমেষ NDA ছেড়ে বেরিয়ে আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক হাতে খড়ি হয়েছিল কংগ্রেস থেকে। তবে সময় এবং সুযোগের খোঁজে রাজনৈতিক সাথী অনেকবার বদল হয়েছে। মমতার এই অনিশ্চয়তার মনোভাব চার দশক আগে বোঝা গেছিল। তখন কেন্দ্রে ক্ষমতায় কংগ্রেস। ভারতজুড়ে কংগ্রেসের বিশৃঙ্খলা মনোভাব বাংলায় নতুন করে ভাবমূর্তি গড়ে তোলেন মাননীয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ১৯৭৪ এ জয় প্রকাশ নারায়ন কংগ্রেসের এক সভা করতে কলকাতায় আসেন। জয়প্রকাশ নারায়ণের মার্সিডিজের উঠে পড়েন ১৬-১৭ বছরের এক যুবতী। কারো জানা ছিল না তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হবেন পরবর্তীতে। প্রথম পরিচিতি লাভ করেন এই ঘটনার পর থেকে। আর এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কংগ্রেসের অন্দরে নতুন অক্সিজেনের যোগান দেয়। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৮৪ এর লোকসভা নির্বাচন যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যাদবপুর থেকে তখনকার বিশিষ্ট বামপন্থী নেতা সোমনাথ চ্যাটার্জি কে বিপুল ভোটে পরাজিত করেন।



এমপি হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজিব গান্ধী সংস্পর্শে আসেন, এই অ্যাক্টিভ নেত্রীকে দেখে রাজীব গান্ধী ও বিস্মিত হয়েছিলেন। আর খুব তাড়াতাড়ি রাজীব গান্ধীর ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু তার লক্ষ্য একটাই ছিল বাংলা। বামপন্থী দুর্গ কে বাংলা থেকে কিভাবে উপড়ে ফেলা যায় সেটা নিয়েই তিনি বেশি চিন্তিত ছিলেন। গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অরাজকতা সৃষ্টির ফলে ১৯৯০ সালের ১৬ আগস্ট কংগ্রেস  ধর্মঘটের ডাক দেয়। কলকাতার হাজরা মড়ে মিছিল বেরায় মমতার নেতৃত্বে। আর তখনই সামনেথেকে CPI এর রেলি চলে আসে আর হাজরা মরে হয়ে যায় বিশাল সংঘর্ষ। আর সেই সংঘর্ষে মমতা আহত হন গুরুতর। তার উপর লোহার রড এবং কাঠের দণ্ড দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেটে যাওয়ার ক্ষত দেড় মাসের মধ্যে তো ঠিক হয়ে গেল কিন্তু তার মনের মধ্যে যে চাপলো সেটা শেষ হয়নি হয়তো। 


হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে তিনি আর কোনো সাধারণ কংগ্রেসের নেতা রইলেন না। পশ্চিমবঙ্গের বাম দুর্গ জ্বালানর জন্য তিনি বারুদ হয়ে উঠলেন। তবে বামপন্থীদের দুর্গ নষ্ট করা এত সজা ছিল না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খুব তাড়াহুড়োর জন্য কোনো কিছু না ভেবেই NDA এর সাথে যোগ দেন। কিন্তু NDA এ গিয়ে তিনি দেখলেন আখেল ক্ষতি হচ্ছে তার। 
 


তারপর ২০০৪ এর  কংগ্রেস এর হয়ে UPA বাম জোটে বাংলায় সরকার গড়েন বামপন্থীরা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলা রাজনীতিতে একা পড়ে গেছিলেন। উনি  একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। আর সেই সুযোগ বামপন্থী নিজেরাই করে দিলেন। বামপন্থীরা ২০০৬ এর  বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জেতার পর । বামপন্থীদের ক্ষমতার দম্ভ আকাশ ছুঁয়ে যায়। তিন দশক বাংলায় রাজ করার পর। শিল্পের জন্য খুবই তড়িঘড়ি কৃষকদের জমি নিতে শুরু করে ‌‌। আর এই পরিকল্পনা তাদের দুর্গে ঘুন ধরতেছে করে। এখানে বলা দরকার যখন ১৯৭৭ বামপন্থীরা ক্ষমতায় আসেন গরীব ও দুস্থদের মধ্যে এই জমি বিলিয়ে। আর সেই সহকার ২০০৬ এ গিয়ে কৃষকদের হাত থেকে শিল্পের জন্য জমি নিতে শুরু করে।



মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকারের বিরুদ্ধে কৃষকদের মনে মনেই ক্ষোভের আগুন জ্বলতে থাকে। সিঙ্গুরে জমি বিবাদ শুরু হতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই আগুনে ঘি ঢালতে শুরু করেন। কৃষকদের বুকে ধিক ধিক করে জলে আগুন দাও দাও করে জ্বলে উঠতে শুরু করে। কৃষক রাস্তায় নেমে আন্দোলন শুরু করে। আর এর নেতৃত্বদেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তর্ক বিতর্কে অংশগ্রহণকারী বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত থেমে থাকেননি তারাও জোর কদমে সমালোচনা করেন বাম সরকারের। কিষানের পাশে এসে দাঁড়ান তারা। জ্বলতে থাকা কৃষকের বুকে দাও দাও করে আগুন আপনা আপনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিজয়ের মশাল হয়ে ওঠে।

বামফ্রন্টের ঘাট থেকে UPA সমর্থন তুলে নেন। আর এরপর UPA সরকারের সাথে কংগ্রেস- তৃণমূল কংগ্রেস জোট করে ২০০৯ এ  । যার ফলে ৪২ টি সিটের মধ্যে ২৬ টি সিট পান। যার মধ্যে ১৯ সিট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছিল। এই ছিল বাংলা রাজনীতিতে পরিবর্তনের ট্রেলার মাত্র। পরের বছরই পৌরসভা ভোটে প্রচুর জায়গায় টিএমসি জিততে থাকে বিপুল আসলে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পায়ের তলার মাটি শক্ত হতে থাকে ক্রমে ক্রমে।


শেষমেষ ৩৪ বছরের দুর্গ ধুলিস্যাৎ করতে পারলেন এই সাধারন এক মহিলা। ২৯৪ টি সিটের বিধানসভাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করলেন। ৭ জানুয়ারি  ১৯৯৩  মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাইটার্স বিল্ডিং এ ধর্না দেওয়ার সময় তাকে তুলে নিয়ে বাইরে ফেলে দেওয়া হয়। ১৮ বছর পরে মমতা মুখ্যমন্ত্রী হয়ে রাইটার্স বিল্ডিং-এ পা রাখেন তিনি। কিন্তু এত বড় পাওনার পরেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটুও বদলাননি। না ওনার সেই কন্ঠ বদলেছে। না তার চালচলন। না তার দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁতের সেই ধবধবে সাদা শাড়ি। পায়ে হাওয়াই চপ্পল ‌‌। আর পুরানো গাড়ি করে তার চলাচল বলে দেয় সংঘর্ষ এখনো অনেক বাকি। 
 



২০২১ এ BJP এর পালে অনেকটা হওয়া থাকা সত্বেও খুব একটা সুবিধা হয়। তৃণমূল থেকে বহু তাবড় তাবড় নেতা বিজেপিতে যোগদান করেন। তবে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে তমার মত শক্তি হয়তো BJP এর  হাতে ছিল না। ২০২১ এ বাংলায় আবারো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসেন মমতা। তবে শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রাম থেকে পরাজিত হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তা সত্ত্বেও তার দল তৃণমূল কংগ্রেস ২১৩ টি আসন নিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেন। সেখানে ভারতীয় জনতা পার্টি তাদের ৭৭ এ আটকে যায়। বামপন্থীদের অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে গিয়েছে যে তারা একটা আসনও লাভ করতে পারেনি।


তার গুনাগুন হয়তো তার এই পরিবার থেকেই পাওয়া। কালী ঘাটে এক মধ্যবর্তী পরিবারে কমলেশ্বর দত্ত এবং গায়ত্রী দেবীর কন্যা মমতার জন্ম ৫ জানুয়ারি ১৯৫৫ তে। মমতা  বয়েস যখন ৯ বছর ছিল তখনই তার বাবার হাত তার মাথার উপর থেকে উঠে যায়। সংঘর্ষের যে বিভীষিকাময় রূপ সেই কাল থেকেই শুরু হয় তাঁর জীবনে। আর কিভাবে লড়তে হয় সে খুব শিখে নেয় খুব তাড়াতাড়ি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী থেকে পদত্যাগ করে দীনেশ ত্রিবেদী কে সেই পদে আসীন করেন। কিন্তু দীনেশ ত্রিবেদী তার নিজের ইচ্ছায় রেলের কার্যক্রম পরিকল্পনা নিছেই নিতে থাকেন। যার ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের  কাছে তার আস্থা কমতে থাকে। মমতা বন্দোপাধ্যায় তিনি লেখক যেমন অপরদিকে খালি সময়ে তিনি ছবিও আঁকেন। 
 

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন