আপনার জানি কিছুদিন আগে কেন্দ্র সরকার এক দেশ এক আইন ব্যবস্থাপক লাগু করবার জন্য তৎপর হয়ে উঠেছে। আপনারা যারা হয়তো জানেন না তারা হয়তো অবাক হচ্ছেন, এক দেশ এক আইন মানে? একটা দেশে তো একটাই আইন থাকার কথা। আজ্ঞে হ্যাঁ, উন্নত পশ্চিমা দেশগুলোতে একটাই আইন থাকে। কিন্তু আমাদের মত অভাগা দেশের এক এক মানুষের জন্য এক এক আইন বলবৎ করা আছে। আপনি হয়তো শুনে অবাক হচ্ছেন আমরা এমন অভাগা যে এই 2021 এ এসে দিল্লি হাইকোর্ট গুলোকে বলতে হচ্ছে এবার অন্তত Uniform Civil Code কে লাগু করা হোক।
আর আমাদের দুর্ভাগ্য এই বিভিন্ন প্রদেশের রাজনৈতিক বিদ যারা ভোটব্যাঙ্ক সর্বস্ব রাজনীতি করে থাকে তারা ইতিমধ্যে বলতে শুরু করেছে যে এই Uniform Civil Code এটি চালু করা মানে একটি ধর্মের মানুষ একটি কমিউনিটির মানুষের আস্থায় আঘাত করা হবে। আর আপনারা তো জানেন আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের কথা। তারা হয়তো কবে বলে বসবে মানুষ একটা বিয়ে করবে কি চারটে সেটা কি সরকার ঠিক করে দেবে? অতএব ইউনিফর্ম সিভিল কোড চলবে না। বিজেপি সরকার খারাপ, মোদি সরকার খারাপ, মোদি সরকার নিপাত যাক। আর এই যখন আমাদের বুদ্ধিজীবীদের চরিত্র । তখন আমাদের মত সাধারণ মানুষের বলতেই হবে আধুনিক ভারতের স্বার্থে ইউনিফর্ম সিভিল কোড বলবং করতেই হবে। জনস্বার্থের স্বার্থে অথবা দেশের স্বার্থে একইভাবে সবথেকে বড় পদক্ষেপ। এই টপিক নিয়ে লেখা অথবা ভিডিও বানানো খুবই বিপদজনক। কারণ ভারতের পেক্ষাপটে দেখতে গেলে এখানে রাজনীতি হয় অনেকটা ব্যক্তিগত স্বার্থে। ধর্ম-অন্ধ মানুষেরা এটা কখনোই মেনে নেবেন না ।
Uniform Civil Code কি?
এই তিনটি শব্দ বন্ধনির মধ্যে Code শব্দটির অর্থ হলো নিয়ম কানুন, আইন গ্রন্থ, সংহিতা বা দন্ডবিধি। ক্রিমিনাল ক্ষেত্রে চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ ও লুট এই সমস্ত ক্ষেত্রে কোড কে ব্যবহার করা হয়। তখন সেটাকে বলা হয় Indian Penal Code বা ভারতীয় ফৌজদারী দণ্ডবিধি। এটি যদি ভারতের নির্বাচন সংক্রান্ত কোড হয় তবে তাকে বলা হয় Model Code of Conduct বা নির্দিষ্ট ভোটের আচরণ বিধি। আর বিষয়টি যদি Civil বা ব্যক্তিগত হয় তখন সেটিকে বলা হয় Civil Code। আর এই Civil Code মূলত চারটি বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এক Marriage বা বিবাহ, দুই Divorce বা বিচ্ছেদ, তিন Inheritance বা উত্তরাধিকার আর চার Adoption বা দত্তক। কথা হল আমাদের দেশে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে ইন্ডিয়ান পিনাল কোড বা ক্রিমিনাল কোর্ট এখানে অভিন্ন বা Uniform। অর্থাৎ চুরি ডাকাতি খুন ধর্ষণ জন্য সমস্ত ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একই রকম ইউনিফর্ম আইন দ্বারা বিচার করা হবে। একইভাবে আমাদের দেশের Model Code of Conduct বা ভোটের সময় যে আইন-কানুন লাগু হয় সেটা হিন্দু, মুসলিম, শিখ, পারসি সবার জন্য কিন্তু এক বা Uniform আইন লাগু করা আছে।
কিন্তু আমাদের সিভিল কোর্ট এক এক ধর্মের জন্য এক এক রকম অর্থাৎ ভিন্ন যার মানে Uniform নয়। যেমন হিন্দুদের জন্য হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ এদের জন্য হিন্দু আইন আছে। আর মুসলিমদের জন্য মুসলিম পার্সাল ল । আবার খ্রীস্টানদের জন্য আলাদা আইন আছে। ধরা যাক বিবাহের ক্ষেত্রে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান এদের বিয়ের আইন একটি নির্দিষ্ট একটি প্রথম বউ জীবিত থাকতে থাকতে এরা দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারে না। কিন্তু মুসলিম পার্সাল আইন অনুযায়ী একজন মুসলিম পুরুষ প্রথম বউ এর অনুমতি নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে বা তার পরেও বিয়ে করতে পারে। অর্থাৎ মুসলিম পুরুষের ক্ষেত্রে পলিগ্যামি বা একাধিক বিবাহ বা বহুবিবাহ আইনিভাবে স্বীকৃত। আবার ডিভোর্সের ক্ষেত্রে যদি আসেন তাহলে হিন্দু,বৌদ্ধ, শিখ এদের বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা এক প্রকারের চলে আবার মুসলিম মতে বিবাহ-বিচ্ছেদের মামলায় শরিয়া আইন মোতাবেক হয়। উত্তর অধিকারী ব্যাপারটা ও কিন্তু আলাদা, হিন্দুদের ক্ষেত্রে একরকম এবং মুসলিমদের ক্ষেত্রে আর আরেকরকম। ধরুন কারো যদি বাবা মারা যায় মুসলিম আইন অনুসারে সেই সম্পত্তির ভাগ নাতি পাবে কিনা ঠিক করবে ঠাকুর দাদা। কিন্তু হিন্দু সম্পত্তির উত্তরাধিকারী আইনে, যে শিশু এখনো জন্মায়নি মাতৃগর্ভে রয়েছে। তার যদি বাবা মারা যায় সেও কিন্তু সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারবে। Adoption বা Guardianship বা দত্তক এর ক্ষেত্রেও কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন আইন প্রযোজ্য হয়।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে USA, UK, France, Japan, German এই সমস্ত সারা উন্নত দেশগুলোতে সেখানে সকলের জন্য সব ধর্মের জন্য একটিই আইন যখন রয়েছে uniform Civil Code রয়েছে । তবে ভারতবর্ষের মতো দেশে Uniform Civil Code নেই কেন?
এটি যদি সঠিকভাবে জানতে হয় তাহলে ভারতবর্ষের ইতিহাসের দিকে চোখ রাখতে হবে। যদি আমরা মুঘল পিরিয়ড বিশেষ করে ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকাল সম্বন্ধে জানি সেখানে সিভিল কোড এর কোন অস্তিত্ব ছিল না। সেখানে কেজগুলো নিষ্পত্তি করা হতো ধর্মের ভিত্তিতে। হিন্দুদের বিচার করতো হিন্দু প্রধানরা। মুসলিমদের বিচার করতো মাতব্বর বা কাজিরা। কোন নির্দিষ্ট আইন ছিল না। কিন্তু Criminal Code এর ক্ষেত্রে Fatawa E Alamgiri নামক Uniform Civil Code লাগু করে রেখেছিল । সব ধর্মের অপরাধীদের ফতোয়া ই আলমগীরী র মধ্যে দিয়ে একই রকম বিচার হত।
আর তারপরই ইংরেজরা আসে এবং তখন তারা যখন আইন তৈরি করে তারা সিভিল এর ক্ষেত্রে 'হিন্দু কোড' হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও শিখ দের জন্য। 'শরিয়া কোড' মুসলিমদের জন্য। আর 'ইংলিশ কোড' বাকি অন্যান্যদের জন্য। আর অপরাধীদের জন্য 'ইংলিশ কোড' এর তত্ত্বাবধানে সবার জন্য সমান একটি আইন তৈরি হয়। আর এরপর হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও শিখ ঠিক ধীরে ধীরে পাশ্চাত্য শিক্ষার দিকে অগ্রসর হয়। আর হিন্দু ধর্মের মধ্যে রামমোহন রায় , বিদ্যাসাগর, জ্যোতিবা ফুলের মতো ধর্মসংস্কার এর ফলে ধীরে ধীরে হিন্দুদের ওপর থেকে কুসংস্কারের পর্দা উড়তে থাকে। বহুবিবাহ থেকে সতীদাহ প্রথা বন্ধ হয়। পরবর্তীতে B.N. Rau এর তত্ত্ববোধিনীতে স্বাধীন ভারতে একটি কমিটি গঠন করা হয় যারা 1955-1956 বিস্তর গবেষণা করার পর হিন্দুদের আইনের মধ্যে কি কি গাফিলতি আছে। সে গুলোকে মিটিয়ে দিয়ে 4টি বিশেষ আইন তৈরি করে, Hindu Marriage Act, Hindu Succession Act, Hindu Guardianship Act, Hindu Adoption Act. আর তারপর থেকেই হিন্দু ধর্মের মধ্যে লিঙ্গ বৈষম্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন বৈষম্য কম হতে শুরু করেছে। আর এখনো কিন্তু এই সংস্কারটা জারি আছে। আপনারা হয়তো জানেন দক্ষিণ ভারতে একটিমাত্র মন্দিরে মেয়েদের ঢোকার অধিকার ছিল না। সেটা নিয়েও কিন্তু হিন্দুরা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। আর শেষমেষ সেই মন্দিরেও মহিলাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়েছে। এখন ভারতবর্ষে 100 শতাংশ মন্দিরে হিন্দু পুরুষ হিন্দু মহিলা, শিখ পুরুষ শিখ মহিলা , বৌদ্ধ পুরুষ বৌদ্ধ মহিলা, খ্রিস্টান পুরুষ খ্রিস্টান মহিলা, একসাথে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তাদের উপাসনা করতে পারে কোন পার্থক্য নেই।
আরও পড়ুন:পেগাসাস কি,ইসরায়েলি সফটওয়্যার পেগাসাসের ব্যবহার প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত !
কিন্তু অন্যদিকে যদি আপনি মুসলিম সম্প্রদায়ের দিকে তাকান সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই কিন্তু তারা আধুনিকমনস্ক খুব বেশি হয়নি। কিছু অল্প সংখ্যক ব্যক্তি আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ করেলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজ পাশ্চাত্য শিক্ষার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিজেদের কে ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যেই আবদ্ধ রাখে। ফলতো মুসলিম সমাজের অভ্যন্তর থেকে জ্যোতিবা ফুলের মত কোন মানুষ কোন সংস্কর আনতে ভয় পায় বা আনেনি। শুধু তাই না মুসলিমদের ধর্মেকে ছেড়ে খানি করতে ইংরেজরাও ভয় পেত। যদি মুসলিমরা বিদ্রোহ করে দেয়। আর আজকের দিনে নেতারাও কিন্তু এ কিভাবে ভয় পায়। তাদের যদি মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক মুখ ফিরিয়ে নেয়। উদাহরণস্বরূপ 1937 তৎকালীন মুসলিম লীগ এটা বলেছিল, তারা তাদের আইনের কোনো সমর্থন চায় না মুসলিমদের জন্য সিভিল কোড হিসাবের শরীয়ত আইন বলবর্ধক এবং সেইটা আজকের দিন পর্যন্ত 2021 সালেও কিন্তু চলছে। মাঝখানে যখন সংবিধান লেখা হয় তখন বাবাসাহেব আম্বেদকর চেয়ে ছিলেন ভারতবর্ষের সমস্ত ধর্মের জন্য একটাই আইন থাকুক। কিন্তু বলতে কোনো রকম বাধা নেই সেই সময় নেহেরু কিন্তু এটা চাননি। তিনি হয়তো ভয় পেয়ে গেছিলে এখনই হয়তো দাঙ্গা বেঁধে যেতে পারে। একরকম বাধ্য হয়েই বাবাসাহেব আম্বেদকর আর্টিকেল 44 এ লিখে দিয়ে যান ভারত সরকার পরবর্তীকালে ইউনিফর্ম সিভিল কোড এক দেশ এক আইন এই আইন বলবং করতে লাগাতার চেষ্টা করবে।
আজকের সময় দাঁড়িয়ে কেন্দ্র সরকার চাইছে আমাদের দেশে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আমাদের দেশে এক আইন হোক বা Uniform Civil Code লাগু হোক। কিন্তু মুশকিল হল যখন ইউনিফর্ম সিভিল কোর্টের কথা আসছে তখনই সমাজের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিবাদ আসতে শুরু করে। একশ্রেণীর রাজনীতিবিদ যারা ভোট ব্যাংক সর্বস্ব রাজনীতি করে। তারা চায় যে করেই হোক যেনতেন প্রকারে একটা ধর্মের মানুষের কোন প্রগতির দরকার নেই। তারা সব সময় তাদের ভোটব্যাঙ্ক হয়ে থাকুক। সেই জন্যই তাদের কথায় একজন পুরুষ একটা বিয়ে করবে কি চারটে বিয়ে করবে এটা কেন কেন্দ্র সরকার বলে দেবে। আলাদা করে তাদের আইন আছে থাক না Uniform এর দরকার কি?
আর কিছু মৌলবী রয়েছে , যারা ধর্ম-অন্ধ মৌলবী তারা বলবে কোন কিছু করতে গেলেই তারা বলবে, মুসলিম ধর্মের প্রতি এটি নাকি আঘাত। আপনারা ভালো করে ভেবে দেখুন ইউনিফর্ম সিভিল কোড আশা মানে মুসলিম ধর্মের প্রতি আঘাত নয়। যে সমস্ত মৌলবী মুসলিমি শরীয়ত আইনের পক্ষে কথা বলবে আপনি সেই সমস্ত মুসলিম মৌলবীদের যদি জিজ্ঞাসা করে কেন শুধুমাত্র সিভিল কোডকেই তার অ্যাডাপ্ট করছে। কেন ক্রিমিনাল কোড শরীয়ত আইন মাতে নিতে চাইছে না। যদি শরীয়ত মতে ক্রিমিনাল কোডে বিচার হয় তবে চুরি করার শাস্তি হাত কেটে দেওয়ার মতো কঠোর আইন আনতে হয়। সামান্য সামান্য অপরাধী যেমন গলা কেটে দেওয়া পাথর ছুড়ে হত্যা করা সেগুলোকেও বলবৎ করা দরকার। এই ধর্মান্ধ মানুষগুলো এতটাই ভন্ড যে তারা Civil Code এর সুবিধাগুলো নিতে চাইবে। কিন্তু শরীয়ত আইন অনুযায়ী কখনও চাইবেনা ক্রিমিনাল কোড চালু হোক। আর কিছু রয়েছে হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা ক্রমশ পথে নেমে পড়বে পরেরদিনই। তারা বলবে মুসলিমদের ধর্মটিকে ধ্বংস করার জন্য এটা কেন্দ্র সরকার ষড়যন্ত্র করছে। আমরা মনে করি ধর্মীয় স্বতন্ত্রতা থাক, আলাদা আলাদা নীতি থাক, কিন্তু আইনটা যেন সবার জন্য এক হয়। হিন্দুরা ঘি বা আগুন জেলে বিয়ে করুক। কিন্তু রেজিস্ট্রেশন টা যেন তাদের কোর্টে হয়। ঠিক মুসলিম তাদের মৌলবি ডেকে কবুল কবুল বলে বিয়ে করুক তবে রেজিস্ট্রেশন এর জন্য কোর্টে হয়। ঠিক খ্রিস্টানরা চার্চে গিয়ে পড়লেও রেজিস্ট্রেশন টা যেন কোর্টে বাধ্যতামূলক হয় । ঠিক তেমনি বিবাহবিচ্ছেদ ক্ষেত্রে কি মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ শিখ নির্দিষ্ট আইন মেনে করতে গিয়ে বিবাহবিচ্ছেদ হয়। উত্তরাধিকার আইন এর ক্ষেত্রেও যেন ছেলে হোক বা মেয়ে বা যে ধর্মের হোক আইন যেন সবার একই হয়।
আপনার কি মত আপনি কি Uniform Civil Code কে সমর্থন করে কমেন্ট করে জানান?
আরও পড়ুন:চীন ভারতীয় মিডিয়া কেনা শুরু করেছে, নিউজক্লিক তদন্তের মামলা !
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন