বণ, আমাদের রোজকার রান্নায় ব্যবহৃত নিতান্তই সাদামাটা নুন।গুরুগম্ভীর রসায়ন-শাস্ত্রীয় নাম সোডিয়াম ক্লোরাইড বা NaCl. 

আমরা যে সময় ছোট ছিলাম, তখন এই নুন তৈরি হত সমুদ্রের জল বাষ্পীভূত করে। এটাই ছিল তখন নুন তৈরির প্রধান পদ্ধতি, এবং তা অঢেল পরিমাণে পাওয়া যেত। নুন তখন এত সস্তা ছিল, যে মুদিরা নুনের বস্তা দোকানের বাইরেই ফেলে রাখত সারা রাত।
 


কিন্তু পরিবর্তন শুরু হল ১৯৮৬ থেকে। টাটা গোষ্ঠী রাজীব গান্ধী (Rajiv Gandhi) পরিচালিত সরকারের কাছে ধর্না দিল আয়োডিন- যুক্ত নুন বিক্রি করার অনুমতি চেয়ে। তাদের অজুহাত ছিল এই যে উত্তর পূর্বের রাজ্যগুলিতে মানুষ আয়োডিনের অভাব জনিত অসুখে ভোগে, যা থেকে মুক্তি পেতে তাদের আয়োডিন (Iodized Salt) যুক্ত নুন কার্যকরী হবে।

বাণিজ্যিক স্বার্থ গোষ্ঠীর প্রভাবিত করার প্রয়াস সফল হল। রাজীব গান্ধী সরকার প্রাকৃতিক সামুদ্রিক লবণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সারা ভারতে আয়োডিন- যুক্ত নুনের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে দিল।

যেহেতু টাটারাই ছিল তখন এর একমাত্র উৎপাদক, তারা অনতিবিলম্বে বাজারের একেটিয়া দখল নিল। আশা করি সবার মনে আছে টিভিতে অবিরত সেই শ্লোগান- “টাটা নমক(Tata Salt), দেশ কা নমক।” গৃহিণীরা পছন্দ করতে লাগলেন, যেহেতু বর্ষায় গলে না, পরিমানে লাগে কম, মিশে যায় তাড়াতাড়ি, এইসব গুণ দেখে। কিন্তু এর দাম দাঁড়াল আটপৌরে নুনের পাঁচগুণ।
 


প্রাকৃতিক সামুদ্রিক নুন নিষিদ্ধ করতে টাটাদের উদ্যোগী হওয়ার পিছনে আসল কাহিনী অনেকেরই অগোচর। গুজরাটের মিঠাপুরে টাটা কেমিক্যালসের একটা বিশাল কারখানা ছিল। সেখানে বিভিন্ন রাসায়নিক উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সহ-উৎপাদিত বর্জ্য হিসেবে টন টন রাসায়নিক নুন বেরিয়ে আসতো। এই বর্জ্য মাটি ভরাট করার মতো কাজে বর্জন করা যেত না, কারণ তা কৃষি জমি নষ্ট করবে।তাই টাটা কেমিক্যালসকে সমুদ্র তীর পর্যন্ত রেল লাইন বসিয়ে সমুদ্রে নিয়ে ফেলে আসতে হতো এই নুন(Salt)।

বর্জ্য ফেলার এই বিপুল ব্যয়ের থেকে নিষ্কৃতি পেতেই তাই তারা পশ্চিমী নীতির অনুসরণে আয়োডিন- যুক্ত নুন বিক্রি করার পরিকল্পনা করে। ভারত সরকার যে মুহূর্তে নীতি পরিবর্তন করল, টাটা কেমিক্যালসের বিরাট ব্যয়ের বোঝা রাতারাতি হয়ে গেল উল্টে বিপুল অপ্রত্যাশিত মুনাফার উৎস। কারো এমন অভাবিত সৌভাগ্যের কথা বোঝাতে বাংলায় যে চালু কথা আছে- “মুতে বাতি জ্বলা”, এ যেন তার চাইতেও বেশী ! 
 


সময়ের সাথে মানুষ রাসায়নিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত নুনের অপকারিতার দিকগুলি বুঝতে শুরু করল।
 



১) রাসায়নিক নুনে সোডিয়ামের মাত্রা অনেক বেশী থাকে, যে কারণে অল্প দিলেই নোনতা স্বাদ এসে যায়। দীর্ঘদিন সেবনের ফলে তাই উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের প্রাদুর্ভাব শুরু হল।

২) এই সমস্যার নিয়ন্ত্রণে মানুষ ওষুধ নিতে শুরু করল, ফলে ওষুধ কোম্পানিগুলির ব্যবসা বাড়ল, ডাক্তারদের পসার বাড়ল, হাসপাতালগুলি আরও বেশী উপার্জন করতে লাগল।

৩) মানবদেহে আয়োডিনের মাত্রার ভারসাম্য অতি সূক্ষ্ম সীমায় অবস্থান করে। এই সীমার একটু উপরে নীচে হলেই থাইরয়েড সমস্যার সৃষ্টি হয়। সাধারনভাবে ভারতীয়দের শরীরে আয়োডিনের মাত্রা সুস্থিত, তাদের অতিরিক্ত আয়োডিন গ্রহণের প্রয়োজন নেই। কিন্তু টাটার ‘নুন খেয়ে’ অনাবশ্যক ভাবে সবাই অতিরিক্ত মাত্রায় আয়োডিন গ্রহণ করতে লাগল চিকিৎসকের নিদান না থাকলেও। ফল, থাইরয়েড সমস্যার প্রসার, অতিস্থুলতা ও অন্যান্য নানা উপসর্গের আবির্ভাব।
 


৪) আবারও, ওষুধ কোম্পানি গুলির বিপুল মুনাফা, রক্ত পরীক্ষার কেন্দ্রগুলির স্ফীত ব্যবসা, ডাক্তারদের বর্ধিত পশার, এবং আধুনিক জিম গুলির রমরমা ব্যবসা- “পূর্বে – পরে” ছবিসহ মেদ হ্রাসের টোপ দিয়ে। 
এই যে বিশাল যজ্ঞ আয়োজন, এই সব কিছুর সরল, নিরীহ কারণ হল শুধুমাত্র সরকার দ্বারা কেন্দ্রীয় ভাবে নির্ধারিত আমাদের ‘নুনের চিমটি’। 
 


আমেরিকায় মানুষ যখন এই নুনের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ঝুঁকির বিষয়ে অবহিত হয়ে সরকারকে সামুদ্রিক নুনের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বলে, সরকার তখন আংশিক ভাবে তা তুলে নেয়।
সৈন্ধব লবণ (বা হিমালয়ান রক সল্ট), সামুদ্রিক করকচ নুন, কালো নুন বা খনিজ নুন -- এ সবই হল সুস্বাস্থের জন্যে প্রকৃতির দেওয়া সম্পদ ভান্ডার, যাতে ৭২ থেকে ৮০ প্রকার খনিজ প্রাকৃতিক ভাবেই সুষম অনুপাতে বর্তমান।

মজার বিষয় হল, আংশিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর আমেরিকাতে এখন প্রাকৃতিক নুন পাওয়া যায় চড়া দামে, বিশেষ স্বাস্থপ্রদ বিকল্প হিসেবে, আমাদের এখনকার অরগ্যানিক খাদ্যের মতো। আয়োডিন- যুক্ত রাসায়নিক নুনের থেকে এর দাম প্রায় পাঁচগুণ বেশী!
 


অতএব, সমগ্র কাহিনির নীতিশিক্ষা হল এই যে- প্রাকৃতিক উৎস থেকে উৎপাদিত যে সামুদ্রিক নুন অত্যল্প মুল্যে  অঢেল পরিমানে উপলব্ধ ছিল, সরকার তার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে আবার কয়েক দশক পরে তাকে পুনরায় বাজারজাত করার ব্যবস্থা করল পাঁচগুণ বেশী মুল্যে। একে বলে বাণিজ্যিক কৌশল-নৈপুণ্য এবং সরকারি প্রশাসন-দক্ষতা !

লিখেছেন : Paul Gomez
 

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন