সেদিনটাও ছিল ১৯৪৮ এর ৩রা জুলাই...... নৌসেরা কাশ্মীর । সূর্যাস্তের একটু আগে পাকিস্তানী সেনাদের ছোড়া ২৫ পাউন্ডের একটা গোলা আছড়ে পড়লো ভারতীয় সেনা বাঙ্কারের সামনে । মারাত্মক ভাবে আহত হলেন ডোগরা রেজিমেন্টের এক ব্রিগেডিয়ার । মৃত্যু নিশ্চিত জেনে সঙ্গী সেনাদের বললেন, “I am dying but let not the territory we were fighting for fall to the enemy.” একটু পরেই ঢলে পড়লেন চিরঘুমে । যুদ্ধক্ষেত্রে এদেশে আজ অব্দি এত বড় পদমর্যাদার কোন সেনানী নিহত হননি । ঠিক বারো দিন পর তাঁর বয়স হতো মাত্র ছত্রিশ বছর !
কে এই বীর শহীদ ?

জন্ম ১৯১২  সালে উত্তরপ্রদেশের আজমগড়ে । বাবা ছিলেন পুলিশ অফিসার । খেলাধূলায় ওস্তাদ ছেলেটির  ছোট থেকেই ইচ্ছা ছিল সেনাবাহিনীতে  যোগ দেওয়ার আর তাই BA পাশ করার পরই ১৯৩২ এ আবেদন করলেন ইংল্যান্ডের  Royal Military Academy তে । কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন Sandhurst এ । সাফল্যের সাথে ট্রেনিংয়ের পর একবছর বৃটিশ সেনাদলে থাকেন । ১৯৩৪ এ ভারতে এসে বালুচ রেজিমেন্টে ক্যাপ্টেন পদে যোগ দেন । আফগানিস্তান ও বার্মা সীমান্তে লড়াইয়ে সাফল্যের নিদর্শন স্বরূপ দশবছরে তিনি ব্রিগেডিয়ার পদে উন্নীত হন ।
 
 
এলো ১৯৪৭, স্বাধীনতার পর বিভক্ত হলো দেশ । যদিও বালুচ রেজিমেন্ট পাকিস্তানের ভাগে পড়লো, তিনি কিন্ত পাক সেনাবাহিনীতে যেতে রাজী হলেন না । জিন্নাহ সাহেব লোক মারফত তাকে ভবিষ্যত পাক সেনাপ্রধানের টোপ দিলেও তিনি ভারতেই থেকে যান এবং ডোগরা রেজিমেন্টে যোগ দেন ।

 দেশ স্বাধীন হবার চার মাসের মাথায় পাক সেনার মদতে দুর্ধর্ষ আফ্রিদি উপজাতির হানাদারেরা কাশ্মীর সীমান্তবর্তী পুঞ্চ ও রাজৌরি দখল করে এগুতে লাগলো শ্রীনগরের দিকে । পঁচিশে ডিসেম্বর তারা দখল করে নিলো সামরিক দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌসেরা সেক্টরের ঝাঙর সেনা ছাউনি । পার্বত্য যুদ্ধে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার জন্য উত্তরাঞ্চলের তৎকালীন সেনাধ্যক্ষ জেনারেল কারিয়াপ্পা তাঁকে অনুরোধ করেন এই ঘাঁটি উদ্ধারে ভারতীয় সেনাকে নেতৃত্ব দিতে । নিজে লড়াইয়ে নামলেন ব্রিগেডিয়ার, তিনমাসের দুর্ধর্ষ লড়াইয়ের পর একশো সেনার জীবনের বিনিময়ে  ছিনিয়ে আনলেন ঝাঙর, মারা গেলো হাজারের ওপর হানাদার । কাশ্মীর উপত্যকায় ব্রিগেডিয়ার পরিচিত হলেন নৌসেরা_কা_শের নামে। প্রতিজ্ঞা করেছিলেন ঝাঙর ছাউনি পুনরুদ্ধার না হওয়া অব্দি খাটিয়া বা চারপাইতে শোবেন না এবং অক্ষরে অক্ষরে তা পালন করেছিলেন । 
 
তাকে হত্যার জন্য সেই আমলে পাক সেনা পঞ্চাশ  হাজার টাকা ইনাম ঘোষণা করেছিলো ! এবার পাকিস্তান তাদের নিয়মিত সেনা ও গোলন্দাজ বাহিনী পাঠালো , শুরু হলো ছাউনি লক্ষ করে ভয়ঙ্কর ও  লাগাতার গোলাবর্ষণ ।হেড কোয়ার্টারের আদেশ পেয়েও ঘাঁটি ছাড়লেন না ব্রিগেডিয়ার, পাছে অধীনস্থ সেনার মনোবল ভেঙে যায় । তারপর এলো সেই কালো দিন  

বিলেত যাবার আগে মাকে কথা দিয়েছিলেন, তাই  সারাজীবন মদ স্পর্শ করেন নি, বিয়েও করেননি । বেতনের প্রায় সবটাকা খরচ করতেন অভাবী ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য । দুদিন পর পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় দিল্লীর জামিয়া মিলিয়া (Jamia Millia) ইসলামিয়া প্রাঙ্গণে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়, সম্মান জানাতে হাজির ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নেহেরুজীর সাথে গোটা মন্ত্রীসভা । অভূতপূর্ব বীরত্বের জন্য  স্বাধীন ভারতে প্রথম মরণোত্তর "মহাবীর চক্র" সম্মানে ভূষিত হলেন  ব্রিগেডিয়ার মহম্মদ ওসমান (Mohammad Usman) যিনি কোন পরিস্থিতিতেই  নিজের ইমান বিক্রি করেন নি । ‌
 জয়হিন্দ স্যার !
 
            

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন