লকাতার গ্রান্ড হোটেল (Grand Hotel) ওঁরাই বানিয়ে ছিলেন,  আর ব্রিটিশদের আগে ওঁনারা এসেছিলেন  কলকাতাতে। তখন ওঁদের সংখ্যা ৩০ হাজার থাকলেও এখন ১০০। 
 
মাত্র ১০০ হওয়া সত্ত্বেও ওদের কেউ মনে রাখেনি। ব্যস্ত রাস্তার কোণে একটা গির্জা। বিষণ্ণ কবরের সারি। কলকাতার প্রাচীনতম খ্রিস্টান সমাধি। ছিমছাম কলেজ। আর এই সব কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কিছু মানুষ, যারা এসেছিলো সুদূর আর্মেনিয়া থেকে। আর্মেনিয়ানরা ধনী ছিলেন। নীল চাষ, দামি পাথরের অলংকার, জাহাজ, বস্ত্র— অগুনতি ব্যবসা ছিল ওদের। ষোড়শ শতকে ওঁদের ব্যবসাপত্তরের কেন্দ্র ছিল চুঁচুড়া। পরে কলকাতাই হয়ে ওঠে ওঁদের বসবাসের শহর। ১৭৩৪ সালে মানভেল হাজার মালিয়ান বা হুজুরিমাল হাওড়ার কাছে তৈরি করেন আর্মেনিয়ান ঘাট। 

জলপথে আর্মেনিয়ানদের ব্যবসার প্রয়োজনেই এই ঘাটটি তৈরি করা হয়। আরাথুন স্টিফেন (Arathoon Stephen) নামে এক আর্মেনীয় গ্র্যান্ড হোটেল তৈরি করেন। স্টিফেন কোর্ট, হোটেল কেনিলওয়ার্থ, কুইন্স ম্যানসন সহ আরও বহু বাড়ি তৈরি করেছিলেন আর্মেনিয়ানরা। পার্ক ম্যানসন-এর নির্মাতা থাডেয়াস নামে এক আর্মেনীয়ের নাকি রোলস রয়েস (Rolls Royce) ছিল। রেস কোর্সের রাজা জোহানস গলস্তাউন কলকাতায় প্রায় ৩৫০টি অট্টালিকা বানান। রেসকোর্স (kolkata race course) দাপিয়ে বেড়াত তাঁর দেড়শো ঘোড়া। নিজে থাকার জন্য তৈরি করেন নিজাম প্যালেস। সেই সময় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল-এর জন্য দান করেছিলেন ২৫ হাজার টাকা। 
 
সেসব এখন পুরোনো কথা। এখন যারা বেঁচে আছে তাদের ঠাঁই এখন পার্ক সার্কাসের ‘স্যর ক্যাথিক পল চ্যাটার হোম ফর দ্য এল্ডারলি’ নামে এক বৃদ্ধাশ্রমে। অধিকাংশ ঘরই তালাবন্ধ। বৃদ্ধাশ্রম চত্বরেই বহু সমাধি। ওখানকার মানুষ বলে ২৫ ডিসেম্বর ক্রিসমাস পালন করেন না তারা। ফাদার আর্ডসার্ন বললেন, বাইবেলে জিশুর জন্মদিনের কোনও স্পষ্ট উল্লেখ না থাকায়, একেবারে প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী ৬ জানুয়ারি জিশুর জন্মদিন ও ব্যাপটিজম-এর দিন একই সঙ্গে পালন করে আর্মেনিয়ান অর্থোডক্স চার্চ(orthodox church)। বস্তুত চতুর্থ শতকের আগে পর্যন্ত খ্রিস্টানরা এই সময়েই বড়দিন পালন করত। পরে ক্রিসমাসের দিন পালটালেও আর্মেনিয়ানরা নিজেদের ঐতিহ্য থেকে সরে আসেননি।
 
অবশেষে বলা যায় একরাশ স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে বেঁচে আছেন আর্মেনিয়ানরা। আর্মেনিয়া দেশটা এদের কাছে অনেকটা রূপকথার মতো। তারা নিজের বাবা মা-র কাছ থেকে শুধু শুনেছে এই দেশটার ব্যাপারে। কিন্তু এখন এই দেশ, এই শহরই ওদের অস্তিত্ব, ওদের ভালবাসা। তারা তাদের শেষ নিঃস্বাস পর্যন্ত কলকাতাতেই থেকে যেতে চান।
(সংগৃহীত )
 

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন