ভানুর রাণু
১৩২৪ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসের এক দুপুরে রবীন্দ্রনাথ একটি চিঠি খুলে দেখলেন তাতে লেখা আছে - 
"প্রিয় রবিবাবু ,
আমি আপনার গল্পগুচ্ছের সব গল্পগুলি পড়েছি । আর বুঝতে পেরেছি,কেবল ক্ষুধিত পাষাণটা বুঝতে পারিনি । আচ্ছা , সেই বুড়োটা যে ইরানী বাঁদির কথা বলছিল ,সেই বাঁদির গল্পটা বলল না কেন ? শুনতে ভারি ইচ্ছা করে । আপনি লিখে দেবেন ?
আর জয়-পরাজয় গল্পের শেষে রাজকন্যার বিয়ে হল না। কিন্তু আমার দিদিরা বলে, শেখর মরে গেল । আপনি লিখে দেবেন যে , শেখর বেঁচে গেল আর রাজকন্যার সাথে তার বিয়ে হল । কেমন ? সত্যি যদি মরে গিয়ে থাকে , তবে আমার বড়ো দুঃখ হবে ।
আমার আপনাকে খু- উ -উ - উ - উ - উ-খুব দেখতে ইচ্ছে করে ।"চিঠিটি পড়তে পড়তে বেশ অবাক হলেন রবীন্দ্রনাথ - সারাদিন কতই চিঠি না চিঠি আসে -তাদের ভীতর কেউ গুণমুগ্ধ পাঠক , কেউ উন্নাসিক সমালোচকের দল , কেউবা অন্ধ ভক্ত - খালি ভারী ভারী শব্দের জাল বুনে স্তুতি করাই যাদের কাজ ,কেউবা পাঠান নিখাদ প্রশংসা আর অবশ্যই চিঠি আসে তাদের কাছ থেকে যারা রবীন্দ্র - কাব্যের ত্রুটি -বিচ্যুতি খুঁজে বেড়িয়ে পরমানন্দে বিহার করেন ।
 
 
কিন্তু বিশেষ করে ওই যে লাইনটি - "আমার আপনাকে খু- উ -উ - উ - উ - উ-খুব দেখতে ইচ্ছে করে " -হৃদয়য়ের এতখানি গভীরতা তো আগে কেউ কবিকে খামে করে  পাঠায়নি । আমাদের রবীন্দ্রনাথ - যিনি জীবনের ক্ষুদ্রতম ভালোবাসা টুকুকেও সযত্নে সঞ্চিত করে চলেছেন হৃদয়য়ের মণিকোঠায় - তাঁর হৃদয়কে আচ্ছন্ন করার জন্য ওইটুকু লাইনই ছিল যথেষ্ট । এর ভিতর ডাকঘর অভিনয়ে কবি ঠাকুরদা সেজে অভিনয় করে ফেলেছেন - একে একে প্রকাশ করছেন কর্তার ইচ্ছায় কর্ম , অনুবাদ চর্চা , My Reminiscences, Nationalism , Personality , Sacrifice and Other Plays । বিশ্ব সাহিত্যে তখন প্রকাশ পাচ্ছে পাস্তেরনাকের "লাইফ মাই সিস্টার" , হামসুনের "গ্রোথ অফ দি সয়েল" , ভ্যালেরির "দি ইয়ং ফেথ"
,ইয়ুং এর "সাইকোলজি অফ দি আনকন্সাস" কিংবা হিমেনেথের "প্ল্যাটেরো অ্যান্ড আই" । শ্রাবণ শেষে এখন ভাদ্র -রবীন্দ্রনাথ লিখছেন - 
ব্যাকুল বকুল ফুলে   ভ্রমর মরে পথ ভুলে ।।
   আকাশে কী গোপন বাণী    বাতাস করে কানাকানি ,
       বনের অঞ্চলখানি    পুলকে উঠে দুলে দুলে ।। 
বেদনা সুমধুর হয়ে ভুবনে   আজি গেল বয়ে ।।
   বাঁশিতে মায়া টান পূরি   কে আজি মন করে চুরি ,
      নিখিল তাই মরে ঘুরি  বিরহসাগরের কুলে ।।
ভাদ্র মাসের তিন তারিখ  অবশেষে চিঠির উত্তর দিলেন রবীন্দ্রনাথ - এই চিঠির উত্তর যদিও না দিয়ে থাকাই যায় না । চিঠির শেষে লিখেছেন,'শুভাকাঙ্খী, শ্রী শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ", পরের চিঠিতে তা পাল্টে হয়েছে 'শুভানুধ্যায়ী শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কখনো শুধু 'রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর'৷ 
 
 
রবীন্দ্রনাথের চিঠির উত্তরে সে রবিবাবুর' সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আরো অনেকটাই বাড়িয়ে লিখলে -"প্রিয় রবিবাবু,আপনি এতদিন আমাকে চিঠি দেননি বলে খুব রাগ হয়েছিল কিন্তু আপনার চিঠি পেয়ে খুব খুশি হয়েছি৷ আমার ভাল নাম কি জানেন? প্রীতি৷ বেশ সুন্দর নাম না৷ ইস্কুলে সবাই আমাকে প্রীতি বলে ডাকে৷ কিন্তু আপনি আমাকে রাণু রাণু বলেই ডাকবেন৷ আপনার ও নামটা ভালো লাগে কিনা তাই বলছি৷"
 
 
এর পর শুরু হবে পত্র-আলাপন - রবীন্দ্রনাথ হবেন "ভানুদাদা" ।
কিন্তু কে এই প্রীতি ? রবীন্দ্রনাথ যখন পঁয়তাল্লিশ এ পড়েছেন - সেই ১৯০৬ সালে বারাণসীতে হিন্দু ইউনিভার্সিটির দর্শনের অধ্যাপক ফণীভূষণ অধিকারীর ঘরে জন্ম নেয় প্রীতি - যাকে রবীন্দ্র অনুরাগী পাঠক মাত্রই রাণু নামে চেনে । সেই দিনের সেই বালিকা রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়ে তাঁর ভক্ত । বারো বছর বয়স থেকে পাকা হাতের লেখায় পাঠাচ্ছে চিঠি - যত দিন গড়িয়েছে নিজের সব মনের কথা নিঃসঙ্কোচে খুলে বলেছে কবিকে । ভাবতে অবাক ;আগে তখনও কিন্তু সেই বালিকা রবীন্দ্রনাথকে খালি ছবিতেই দেখেছেন । তা হলে সেই মানুষটির প্রতি এতো ভালোবাসার উৎসার এল কি করে ? একেই কি বলে সত্যি কারের প্রেম ? না , মনোবিঞ্জানীরা বলবেন , এ হল ক্ষণিকের মোহ ?
 
 
এই সব নিয়ে তর্ক করবে চশমা আঁটা গবেষকের দল - পাতার পর পতা যুক্তি দেখাবেন - থাক সেই সব যুক্তি- তর্ক শুকনো পাতায় , 
আবেগ অভিমান কি কোন দিন যুক্তি তর্কের ধার ধারে ? দেখা যাক এর পরের দিন গুলি - রাণু ইতিমধ্যে এগারটি চিঠি দিয়ে ফেলেছেন আর উত্তরে কবির কাছ থেকে পেয়েছে সাতটি চিঠি । একদিন রাণু লিখলে ,"একবারে নিশ্চয় আমাদের বাড়িতে আসবেন কিন্তু৷ না এলে আপনার সঙ্গে আড়ি৷ আপনি যদি আসেন তবে আমনাকে আমাদের শেষের ঘরে শুতে দেব৷ " আরও কি লিখতেন রাণু বরং দেখা যাক -" আপনাকে দেখে আমার একটুও ভয় করবে না । আপনি তো খুব সুন্দর দেখতে । আপনি বুঝি ভাবেন আমি আপনার ফটো দেখিনি ।তাতেও তো আপনাকে সুন্দর লাগে । আপনি খুব লম্বা আর সুন্দর । আমার কিন্তু লম্বা লোক বেশ লাগে । আজ হলি কিনা , তাই আপনাকে একটু ফাগ পাঠাচ্ছি । আপনি মুখে মাখবেন । আপনি সুন্দর কিনা , তাই আপনাকে বেশ সুন্দর লাগবে ।শুনুন , আপনি ভালো করে চুল-টুল আঁচড়াবেন । কাপড় বেছে বেছে পরবেন ।আপনি পুজো পর্যন্ত চুল কাটবেন না । তখন বেশ বড় চুল সুন্দর দেখতে হবে । কিন্তু আপনি লক্ষ্মী ছেলে হয়ে থাকবেন । যাতে সুন্দর দেখায় । আমাদের শোয়ার ঘরে আপনার যে ফটো ছিল , সেটা বদলে আপনি নাম লিখে দিয়েছিলেন সেইটা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে । সেইটে বেশি সুন্দর দেখতে তাই ।
 
 
আপনি কি বিশ্ব - প্রকৃতিকে বেশি ভালোবাসেন ? বোধহয় বিশ্ব - প্রকৃতি আপনাকে আমার চাইতে কম ভালোবাসে । আমার আপনার জন্য মন কেমন করে । আমি আপনাকে চুমু দিচ্ছি ... "এই চিঠিখানি পড়লে কেউ কি বিশ্বাস করবে এটি লিখেছে বারো বছরের এক বালিকা ? যাই হোক , অবশেষে এল সেই কাঙ্খিত প্রহর । দেখা হল দুজনায় । দিনটা কি রবীন্দ্রনাথ ভুলতে পেরেছিলেন ? না পারেননি , পারেননি তার অবশ্য আর একটি কারণ আছে । সাল ১৯১৮ - প্রকাশিত হচ্ছে "পলাতকা", "গুরু" , Gitanjali and Fruit- Gathering ,Lover's Gift and Crossing ,The Parrot's Training , Mashi and Other Stories , Strories from Tagore ...দিনটা ছিল ১৫ ই মে - ইতিমধ্যে রাণু কলকাতায় এসেছে , উঠেছে সপরিবারে ল্যান্সডাউন রোডের একটা ভাড়া বাড়িতে , বাবা ফণীভূষণের দারুণ অসুখ । রাণুর যে আর তর সইছিল না ।তাই তো সোজা চলে আসলে জোড়াসাঁকোতে  । রবীন্দ্রনাথকে দেখে কি অবাক হল রাণু ? না একটুও হয়নি । সে যে তার মনের খাতায় এমনি ছবি এঁকেছে আনমনে অবহেলায় । "ছবির সাথে এই মানুষটির দারুণ মিল । "  ছুটে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের হাতের উপর হাত রাখল রাণু । কি অনুভূতি হয়ে ছিল রবীন্দ্রনাথের ? তাঁর ভাষাতেই শোনা যাক - " আমি যখন তোমাকে লিখেছিলুম যে , আমাকে তুমি নারদ মুনি মনে করে হয়ত ভয় করবে , তখন আমি কতো বড় ভুলই করেছিলুম - আমি যে ছফুট লম্বা মানুষ , এত বড় গফ-দাড়িওয়ালা কিম্ভুতকিমাকার লোক , আমাকে দেখে তোমার মুখশ্রী একটুও বিবর্ণ হল না , এসে যখন আমার হাত ধরলে , তোমার হাত একটুও কাঁপল না , অনায়াসে কথাবার্তা আরম্ভ করে দিলে , কণ্ঠস্বরে একটুও জড়িমা প্রকাশ হল না - কী কাণ্ড বলো দেখি ?"সেদিন কতক্ষণ ছিল রাণু ? সে খবর এখনও অবধি খুঁজে পাইনি । কিন্তু , একটা কথা হল , রাণুকে দেখে কিন্তু রবীন্দ্র- হৃদয় উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিল । কেন জানেন ?
 
 

প্রসঙ্গটি একটি মজার ঘটনার ভীতর দিয়ে শুরু করি - 
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে এক দাসী হটাৎ একদিন অতি চিত্কার করে উঠে দাঁতে দাঁত লেগে অজ্ঞান হয়ে গেল ৷ নানান চেষ্টা করে জ্ঞান ফেরানোর পর সে বললে:সে নাকি কাদব্মরী দেবীকে দেখতে পেয়েছে৷আত্মঘাতীর আত্মা নাকি শান্তি পায় না, সে বার বার ফিরে আসতে চায় প্রিয়জনদের কাছে৷ তার প্রিয় ঘরবাড়িতে৷ কাদম্বরী দেবীকে নিয়ে একটা আতঙ্ক ঠাকুরবাড়ির দাস দাসীদের মধ্যে ছিলই৷ কেউ সচারচর যেত চাইত না সেই ঘরের দিকে যে ঘরে কাদম্বরী আফিম খেয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন৷ যে দাসীটি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে শেষ পর্যন্ত রহস্যটি বোঝা গেল৷ কাদম্বরীর প্রেতমূর্ত্তি নয়, সে দেখেছে আসলে রাণুকে৷ অবশ্য দাসীর আতঙ্কিত হওয়াটা খুব অস্বাভাবিক ছিল না৷ যদি কাদম্বরী দেবী ও কিশোরি রাণুর ছবি পাশাপাশি রেখে দেওয়া যায় তবে দুজনের মুখের সাদৃশ্য দেখে বিস্মিত হতে হবেই৷ ফলে জোড়াসাঁকোর বাড়ির অলিন্দের আলোছায়া একটি নিরক্ষর সংস্কার প্রচ্ছন দাসীর ক্ষেত্রে রাণুকে হটাৎ দেখে কাদম্বরীর প্রেতমূর্ত্তি মনে হওয়াটা খুব অস্বাভাবিক নয়৷ শুধু এই নিরক্ষর দাসীর নয়, অনেক উচ্চশিক্ষিত সংস্কার মুক্ত মনের একাধিকবার বিভ্রান্ত হতে দেখা গেছে রাণুকে প্রথম দেখার পর৷
 
 
 
এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধু কৃষিবিজ্ঞানী এলমহার্স্ট বলেছিলেন: "The girl(Rani) so vividly brought back to 
Tagore memory of his boyhood compandon that he begged the forther to leav e her behind as a guest of the poet's hoise. The relationship that developed was deepand lasting."রবীন্দ্রনাথ তাঁর হারানো বৌঠানকে মুগ্ধ চোখে প্রত্যক্ষ করেছেন - আর রাণু যখন অষ্টাদশী ঠাকুর বাড়ির মেয়ে মহলে তো রাণুকে নিয়ে হই চই পড়ে গিয়েছিল , কাদম্বরী
আবার ফিরে এসেছে বলে । 
 
 
পরের দিনটি অর্থাৎ ১৬-ই মে , রবীন্দ্র - জীবনে একটি দারুণ দুঃখের দিন - ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল রবীন্দ্র- হৃদয় আর সেই দিন থেকেই রবীন্দ্র-জীবনের পরিপূরক হয়ে ওঠে রাণু । 
এমন কি ঘটেছিল সেই দিন ? আর কিভাবেই বা রাণুর ভানুদাদা আবার জীবনের মূলস্রোত খুঁজে পেল ?কেনই বা ভানুদাদা 1918 সালের ২0-শে ফেব্রুয়ারী রেণুকাকে লিখেছেন,"দোষ আসলে আমার৷ তুমি সেই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেইছ তখন না হয় আর ত্রিশ চল্লিশ বছর আগেই জন্মাতে৷"এই চিঠির শেষে লেখা- "তোমর প্রাচীন বন্ধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর"৷ 1918 এর 12ই জুলাই রবীন্দ্রনাথকে প্রায় হুকুম করে কেন রাণু লিখেছে: "হ্যাঁ শুনুনু কেউ বয়েস জিজ্ঞেস করলে বলবেন সাতাশ৷," ?
 

 
রবীন্দ্রনাথ যে বয়সের এই পরিবর্তন কেনই বা স্বীকার করে নিয়েছেন ? তার প্রমাণ- 28শে আগষ্ট 1918 সালে রাণুকে লেখা চিঠি -
"..... কিন্তু যখন থেকে তোমার পঞ্জিকা অনুসার আমার 'সাতাশ' বছর বয়স হয়েছে তখন থেকেই বয়সের মানে আপনি ধরা দিয়ে কেটে বেড়াবার আর পথ পাইনি৷এই সব নিয়ে পরবর্তী লেখায় আলোচনা করবো । কৃতজ্ঞতা স্বীকার - চিত্রা দেব , পৃথ্বীরাজ সেন , প্রশান্ত কুমার পাল , বুদ্ধদেব বসু , সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং বরুণ চট্টোপাধ্যায় । 
শ্রী সাত্যকি দত্ত


Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন