এমন কোনোও লোক নেই যারা এদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন না। ট্রাক মালিক থেকে শুরু করে রাস্তার পুলিশ, পথচারী, গোডাউন মালিক, তাদের কর্মচারীরা, এমনকি রাস্তার অন্য গাড়ির ড্রাইভাররা পর্যন্ত একজন অপরজনের সাথে দুর্ব্যবহার করে, গালি দেয়, খিস্তি করে। এদের পরিবারের লোকজনও সম্ভবত এদের ওপর সন্তুষ্ট নয়।
এমনকি আমরা ছোটোবেলায় জানতাম যে এরা খুবই খারাপ লোক। মনে আছে ছোটোবেলায় মালবাহী বড় ট্রাক কে আমরা সাধারণত পাঁইয়া ট্রাক বলতাম, কারণ ড্রাইভারদের বেশীরভাগ পাঞ্জাবী সর্দার হতেন, আর এই পাঞ্জাবী থেকেই হয়তো পাঁইয়া নামকরণ। আমাদের শেখানো হতো যেন পাঁইয়া ট্রাক দেখলেই দুরে পালিয়ে যাই, কারণ এরা খুবই খারাপ লোক, বাচ্চাদের ধরে নিয়ে চলে যায়। সত্যি বলতে এদের সম্পর্কে কখনো কিছু ভালো শুনেছি বলে মনে হয়না।
চুরান্ত থ্যাংকলেস জব একটা। বাস অটো ট্যাক্সি ওলা উবের গাড়ির ড্রাইভারদের হয়তো কেউ কখনো ভুল করে হলেও থ্যাংকইউ বলে ফেলেছে, কিন্তু কোনোও ট্রাক ড্রাইভারকে কেউ কখনো থ্যাংকস বলেছে বলে আমার জানা নেই।
এই মহামারী পরিস্থিতিতে প্রতিটা প্রফেশনের লোক নিজেদের মতো করে দেশের ও সমাজের সেবা করে যাচ্ছে। মেডিক্যাল প্রফেশনালস, পুলিশ, সাফাইকর্মী বিদ্যুৎ জল এবং অন্যান্য পরিসেবা মুলক প্রফেশনের প্রত্যেকেই অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এবং আমরা কখনোও সোস্যাল মিডিয়াতে কখনো বা সামনা সামনি এদেরকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। নেতা অভিনেতা সেলিব্রিটিরা টিভিতে রেডিওতে হামেশাই এদের গুণগান করছে।
আরও পড়ুন:ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তির তৈরি রুদ্র লাইট হেলিকপ্টারের দুই পাশে চারটি করে আটটি ‘হেলিনা’ সংযোজন করা
কিন্তু সবার অলক্ষ্যে রয়ে গেছেন এই পণ্যবাহী ট্রাকের ড্রাইভাররা। গত দেড় বছরে দেশের অর্থনীতির যতটুকুই সচল ছিলো তার সিংহভাগ কৃতিত্ব কিন্তু এদের। পুরো দেশ যখন লকডাউনে নিজের ঘরে বন্দী তখন এরাই কিন্তু সংক্রমনের ভয় দুরে ঠেলে রেখে বিভিন্ন অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ে দৌড়ে বেরিয়েছে। এই যে আমরা ঘরে বসেই ওষুধ থেকে শুরু করে পেনড্রাইভ অব্দি পেয়ে যাচ্ছি তার নেপথ্যে কিন্তু এদের অবদান কম নয়। টেস্ট কিট হোক অথবা রেমডিসিভির এর মতো প্রাণদায়ী ওষুধ অথবা আজকের দিনের অক্সিজেন সিলিন্ডার, এই ট্রাক ড্রাইভারদের সৌজন্যেই কিন্তু পৌছে যাচ্ছে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। অথচ গতবছর একবার বোধহয় প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে এদের নাম উচ্চারণ করেছিলেন কিন্তু তারপর আর কারও মুখে এদের কথা শুনতে পাইনি।
জানি এদের অনেক দোষ আছে কিন্তু তবুও কিছুটা কৃতিত্ব, কিছুটা হাততালি তো এদেরও প্রাপ্য, তাই না?
রায়পুর থেকে তুতিকোরিন যাচ্ছিলেন ড্রাইভার বিজেন্দ্র এবং তার কো ড্রাইভার। রাস্তায় কো ড্রাইভারের জ্বর হওয়ায় তাকে হসপিটালে ভর্তি করে গাড়ি নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে একাই রওনা হয়ে যান বিজেন্দ্র। কিন্তু ততক্ষণে মারণরোগের বিষ ঢুকে পরেছিলো তার শরীরেও। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় হাইওয়ের ধারে গাড়ি সাইড করে বিশ্রাম করার জন্য দাড়িয়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু বুঝতে পারেননি যে অক্সিজেন লেভেল কমে গেছে শরীরে। দুদিন পরে টহলদার পুলিশ ট্রাকের ড্রাইভার কেবিন থেকে উদ্ধার করে বিজেন্দ্রভাই এর নিথর দেহ।
নাহ্, এরকম নিউজ কোনোও মিডিয়ায় এমনকি সোস্যাল মিডিয়াতেও পাওয়া যাবোনা। এরা কখনই করোনা যোদ্ধার সন্মান পাবেনা। এমনকি সাপ্লাই চেনের সাথে যুক্ত না হলে হয়তো আমি নিজেও জানতে পারতাম না।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন